শনিবার, ২০ জুন ২০২৬ | ৭ আষাঢ় ১৪৩৩

Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

বিশ্বজুড়ে বাস্তুচ্যুতির নীরব আর্তনাদ

বিশেষ প্রতিনিধি :   |   শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

বিশ্বজুড়ে বাস্তুচ্যুতির নীরব আর্তনাদ

গত ১০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ২০২৫ সালে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। ছবি : সংগৃহীত

বিশ্বের কোথাও গোলার শব্দ থামছে না, কোথাও নিপীড়নের ভয়ে মানুষ রাতের আঁধারে সীমান্ত পেরোচ্ছে, আবার কোথাও বন্যা কিংবা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া জনপদ ছেড়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়াতে হচ্ছে অসংখ্য মানুষকে। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের কাছে ঘর বলতে আর কোনো নিরাপদ ঠিকানা নেই। একসময় যে উঠোনে শিশুরা খেলত, যে রান্নাঘর থেকে ভেসে আসত সংসারের গন্ধ, সেই ঘরবাড়িই আজ তাদের কাছে স্মৃতি মাত্র।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে একদিকে আশার ক্ষীণ আলো, অন্যদিকে গভীর উদ্বেগের ছবি। গত এক দশকের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো বিশ্বজুড়ে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। কিন্তু সেই হ্রাস কোনো স্থায়ী সমাধানের ইঙ্গিত দিচ্ছে না। কারণ কোটি কোটি মানুষ এখনো দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুচ্যুতির ফাঁদে আটকে আছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে অন্তত ১১ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ পৃথিবীর প্রতি ৭০ জন মানুষের মধ্যে একজন নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। যুদ্ধ, সহিংসতা, রাজনৈতিক নিপীড়ন, বৈষম্য, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগ এই বাস্তবতাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এই বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে প্রায় ছয় কোটি ৮৬ লাখ মানুষ নিজ দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত। তারা আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করেনি, কিন্তু নিজেদের দেশেই নিরাপদ আশ্রয় হারিয়েছে। অন্যদিকে প্রায় দুই কোটি ৮৫ লাখ মানুষ আন্তর্জাতিক শরণার্থী হিসেবে বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু এই প্রত্যাবর্তনের গল্প মোটেই স্বস্তির নয়।

যারা ফিরে গেছেন, তাদের অধিকাংশই এমন জায়গায় ফিরেছেন যেখানে যুদ্ধের ক্ষত এখনো শুকায়নি। বহু এলাকায় ধ্বংস হয়ে গেছে হাসপাতাল, বিদ্যালয়, সড়ক ও বিদ্যুৎব্যবস্থা। নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা কিংবা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। অনেকের জন্য ফিরে যাওয়া ছিল পছন্দ নয়, বরং অনিবার্যতা। ফিরে যাওয়া মানুষের প্রায় ৯২ শতাংশই ছয়টি দেশের নাগরিক।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ ফিরে গেছে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে। দেশটিতে প্রায় ৩৬ লাখ মানুষ নিজ এলাকায় ফিরেছে। সুদানে ফিরে গেছে প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ। সিরিয়ায় ফিরেছে ৩৩ লাখের বেশি। আফগানিস্তানে প্রায় ২০ লাখ, ইউক্রেনে সাত লাখের বেশি এবং মিয়ানমারে চার লাখের বেশি মানুষ প্রত্যাবর্তন করেছে। আফগানিস্তানের ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

গত বছরে প্রায় ২৯ লাখ আফগান নাগরিক দেশে ফিরে গেছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ১৯ লাখই শরণার্থী ছিলেন। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, তাদের বড় অংশই প্রতিবেশী দেশগুলোর কঠোর নীতির কারণে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকের সামনে ফিরে আসা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না। এর ফলে বিশ^ব্যাপী আফগান শরণার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। কিন্তু দেশে ফিরে যাওয়া এসব মানুষের সামনে রয়েছে কর্মসংস্থানের সংকট, দুর্বল অর্থনীতি এবং মৌলিক সেবার অভাব। একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে সিরিয়ায়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলমান সংঘাতের পর গত বছরে প্রায় ১৩ লাখ সিরীয় নাগরিক দেশে ফিরে গেছেন। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রত্যাবর্তনের হার বেড়েছে। তবে নিরাপত্তাহীনতা, ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো, সীমিত জীবিকা এবং বিচ্ছিন্ন সহিংসতা তাদের নতুন জীবনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী দুই দশকের মধ্যে দেশের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে কয়েক কোটি মানুষ জলবায়ুজনিত কারণে বসতভিটা হারাতে পারে। ফলে বিশ^ বাস্তুচ্যুতির সংকট বাংলাদেশের জন্য কেবল মানবিক নয়, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জও বটে। বিশ^ব্যাপী বাস্তুচ্যুতির আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো দীর্ঘমেয়াদি নির্বাসন। বর্তমানে প্রায় ৭০ শতাংশ শরণার্থী পাঁচ বছর কিংবা তারও বেশি সময় ধরে নিজ দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। তাদের একটি বড় অংশ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

একজন শিশুর জন্ম হচ্ছে শরণার্থী শিবিরে, সেখানেই তার বেড়ে ওঠা। অনেকেই কখনো নিজের দেশের মাটি দেখেনি। শিক্ষার সুযোগ সীমিত, স্বাস্থ্যসেবা অপ্রতুল, মানসিক আঘাত দীর্ঘস্থায়ী। নারী, শিশু ও প্রবীণরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এই বাস্তবতায় জাতিসংঘ দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থী সংকট কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থীর সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন উৎসাহিত করা এবং পুনর্বাসনের পথ সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে কাজটি সহজ নয়। অনেক উন্নত দেশ অভিবাসন নীতি কঠোর করেছে। তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগও কমে এসেছে। অথচ পুনর্বাসনের প্রয়োজন রয়েছে এমন মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ফলে আশ্রয়প্রার্থীদের অনিশ্চয়তা আরও গভীর হচ্ছে।

সংস্থাটির শীর্ষ নেতৃত্বের মতে, আশ্রয় ও সুরক্ষা মানুষের জীবন রক্ষার জন্য অপরিহার্য। কিন্তু এমন ভবিষ্যৎ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, যেখানে লাখ লাখ মানুষ বছরের পর বছর বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থেকে জীবন পুনর্গঠনের কোনো বাস্তব সুযোগ পাবে না। বিশ্ব শরণার্থী দিবসের প্রাক্কালে এই বার্তাই যেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে- শরণার্থীরা কেবল পরিসংখ্যান নয়, তারা মানুষ।

তাদেরও আছে স্বপ্ন, সম্মান এবং নিরাপদ জীবনের অধিকার। তাই এই সংকটের সমাধান কেবল মানবিক সহায়তা বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধান, আন্তর্জাতিক সংহতি, ন্যায়ভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দৃঢ় অঙ্গীকার। পৃথিবীর প্রতি ৭০ জন মানুষের মধ্যে একজন যখন ঘর-হারা, তখন এই সংকট আর কোনো নির্দিষ্ট দেশের নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির বিবেকের পরীক্ষা।

Posted ১০:০৭ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

86-47 164th Street, Suite#BH
Jamaica, New York 11432

Tel: 917-304-3912, 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: weeklybangladesh@yahoo.com

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.